লিভার শরীরের সবচেয়ে নীরব অঙ্গ। এর ৭০ থেকে ৮০ ভাগ নষ্ট না হলে সাধারণত কোনো লক্ষণ দেখা দেয় না। এই নীরবতার কারণেই লিভার সিরোসিস অনেক সময় উন্নত পর্যায়ে ধরা পড়ে। অথচ বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও ফ্যাটি লিভারের প্রকোপ বেশি হওয়ায় সিরোসিসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা কম নয়।
লিভার সিরোসিস কী এবং কীভাবে হয়
লিভার একটি পুনরুজ্জীবনশীল অঙ্গ। সাধারণ ক্ষতি থেকে নিজেই সেরে উঠতে পারে। কিন্তু বারবার বা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির শিকার হলে লিভার সেরে ওঠার সময় পায় না। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে স্বাভাবিক কোষের বদলে শক্ত দাগ টিস্যু (Fibrosis) তৈরি হতে থাকে। এই প্রক্রিয়া বছরের পর বছর চলতে থাকলে একসময় পুরো লিভারের গঠন বদলে যায়, একে বলা হয় সিরোসিস।
সিরোসিস হলে লিভার তিনটি প্রধান কাজ করতে পারে না:
- রক্ত পরিষ্কার করা ও বিষাক্ত পদার্থ দূর করা
- প্রোটিন ও জমাট বাঁধার উপাদান তৈরি করা
- পিত্তরস তৈরি করে হজমে সাহায্য করা
কারণ
বাংলাদেশে সবচেয়ে সাধারণ কারণ:
- হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সংক্রমণ (দেশে সিরোসিসের সবচেয়ে বড় কারণ)
- হেপাটাইটিস সি ভাইরাস সংক্রমণ
- নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD) — ডায়াবেটিস ও স্থূলতার কারণে
- দীর্ঘমেয়াদি মদ্যপান
অন্যান্য কারণ:
- অটোইমিউন হেপাটাইটিস (শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজেই লিভার আক্রমণ করে)
- দীর্ঘমেয়াদি পিত্তনালির সমস্যা
- বংশগত রোগ যেমন Wilson’s Disease বা Hemochromatosis
- দীর্ঘদিন ক্ষতিকর ওষুধ বা রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ
সিরোসিসের পর্যায়
সিরোসিস দুটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়:
Compensated Cirrhosis (ক্ষতিপূরণকৃত):
লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এখনো প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারছে। বেশিরভাগ সময় কোনো লক্ষণ থাকে না। এই পর্যায়ে ধরা পড়লে অগ্রগতি অনেকটাই থামানো সম্ভব।
Decompensated Cirrhosis (জটিল পর্যায়):
লিভার আর স্বাভাবিক কাজ করতে পারছে না। জলোদর, রক্তবমি বা মস্তিষ্কে বিষক্রিয়ার মতো জটিলতা দেখা দেয়। এই পর্যায় অনেক বেশি বিপজ্জনক।
লক্ষণ
প্রাথমিক পর্যায়ে (প্রায়ই কোনো লক্ষণ থাকে না):
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা
- খাবারে অরুচি
- হালকা বমি বমি ভাব
- পেটের ডান উপরে হালকা অস্বস্তি
উন্নত পর্যায়ে:
- জন্ডিস: ত্বক ও চোখ হলুদ হওয়া, প্রস্রাব গাঢ় হলুদ
- পেটে পানি জমা (Ascites): পেট ফুলে ওঠা
- পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া
- হাতের তালু লালচে হয়ে যাওয়া (Palmar Erythema)
- ত্বকে মাকড়সার জালের মতো রক্তনালি দেখা যাওয়া (Spider Angioma)
- চুল পড়া ও পুরুষদের বুকে চর্বি জমা
- মলে রক্ত বা কালো মল
- মাথা ঘোরা ও মানসিক বিভ্রান্তি (Hepatic Encephalopathy)
- ত্বকে চুলকানি
রোগ নির্ণয়
| পরীক্ষা | কী জানা যায় |
| LFT (Liver Function Test) | লিভারের কার্যক্ষমতা ও ক্ষতির মাত্রা |
| CBC | রক্তশূন্যতা ও প্লেটলেট কমেছে কিনা |
| PT/INR | রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা |
| HBsAg, HCV | হেপাটাইটিস বি ও সি নির্ণয় |
| AFP (Alpha-fetoprotein) | লিভার ক্যান্সারের স্ক্রিনিং |
| আল্ট্রাসনোগ্রাফি | লিভারের আকার, গঠন ও পোর্টাল শিরার অবস্থা |
| Fibroscan | লিভারের শক্ততা মাপা, বায়োপসির বিকল্প |
| CT Scan বা MRI | বিস্তারিত মূল্যায়ন ও ক্যান্সার শনাক্ত |
| Liver Biopsy | সিরোসিসের মাত্রা নিশ্চিত করা |
আমাদের লিভার ও গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞ
Dr. Salman Rafat
MBBS, BCS (Health), MD (Gastroenterology)
Liver Diseases
Medicine
চিকিৎসা
কারণভিত্তিক চিকিৎসা:
হেপাটাইটিস বি থেকে সিরোসিস হলে বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা লিভারের আরও ক্ষতি থামাতে পারে। ফ্যাটি লিভার থেকে হলে ওজন কমানো ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণই মূল চিকিৎসা।
জটিলতার চিকিৎসা:
- পেটে পানি জমলে কম লবণের খাবার ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শে চিকিৎসা নিতে হবে। প্রয়োজনে পানি বের করে নেওয়ার (Paracentesis) ব্যবস্থা করা হয়
- খাদ্যনালিতে ফোলা শিরা থাকলে এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়
- মানসিক বিভ্রান্তি বা Hepatic Encephalopathy হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি
লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট:
Decompensated Cirrhosis বা লিভার ক্যান্সারে ট্রান্সপ্ল্যান্ট একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
প্রতিরোধে যা করবেন
- হেপাটাইটিস বি টিকার তিনটি ডোজ সম্পন্ন করুন
- HBsAg পজিটিভ থাকলে নিয়মিত ফলোআপ ও চিকিৎসা করুন
- ফ্যাটি লিভার থাকলে ওজন কমান ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করুন
- মদ্যপান সম্পূর্ণ বন্ধ করুন
- ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ ও হার্বাল সাপ্লিমেন্ট এড়িয়ে চলুন
- প্রতি ৬ মাসে আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও AFP পরীক্ষা করুন
কখন ডাক্তার দেখাবেন
- পেট ফুলে উঠলে বা পায়ে পানি জমলে
- ত্বক বা চোখ হলুদ হয়ে গেলে
- হেপাটাইটিস বি পজিটিভ থাকলে এবং দীর্ঘদিন ফলোআপ না করলে
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও ওজন কমতে থাকলে
- LFT রিপোর্টে অস্বাভাবিক ফলাফল পেলে
⚠ জরুরি সতর্কতা
এই লক্ষণগুলো দেখলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান:
- বমিতে বা মলে রক্ত দেখা গেলে (খাদ্যনালির ফোলা শিরা ফেটে যাওয়ার লক্ষণ)
- হঠাৎ মানসিক বিভ্রান্তি, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা অজ্ঞান হয়ে গেলে
- পেট হঠাৎ তীব্র ব্যথাসহ ফুলে উঠলে
💡 বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে
লিভার সিরোসিস রোগীদের একটি বড় অংশ হার্বাল বা কবিরাজি ওষুধ খেয়ে লিভারের আরও ক্ষতি করেন। বাজারের কোনো “লিভার টনিক” বা ভেষজ ওষুধ সিরোসিস সারায় না। বরং এগুলো লিভারের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে অবস্থা দ্রুত খারাপ করতে পারে।
মাদানী হসপিটালে লিভার সিরোসিসের পরীক্ষা ও পরামর্শ কীভাবে নেবেন
মাদানী হসপিটাল লিমিটেডে LFT, AFP, HBV DNA, আল্ট্রাসনোগ্রাফিসহ লিভার সংক্রান্ত সব প্রয়োজনীয় পরীক্ষা একই জায়গায় করানো সম্ভব। গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞ রিপোর্ট দেখে সিরোসিসের পর্যায় নির্ধারণ করে ব্যক্তিগত চিকিৎসাপরিকল্পনা তৈরি করেন। হেপাটাইটিস বি পজিটিভ রোগী বা ফ্যাটি লিভারের রোগী যারা দীর্ঘদিন ফলোআপ করেননি, তারা দেরি না করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসতে পারেন।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
প্রশ্ন ১: লিভার সিরোসিস হলে কি আর ভালো হওয়া সম্ভব?
উত্তর: সিরোসিসে যে দাগ টিস্যু তৈরি হয় তা সম্পূর্ণ আগের অবস্থায় ফেরে না। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এবং কারণ নিয়ন্ত্রণ করলে অনেক রোগী বছরের পর বছর স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন। হেপাটাইটিস বি-জনিত সিরোসিসে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধে লিভারের অবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো হতে পারে।
প্রশ্ন ২: লিভার সিরোসিস থেকে কি লিভার ক্যান্সার হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, সিরোসিস লিভার ক্যান্সারের (Hepatocellular Carcinoma) সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কারণ। এজন্য সিরোসিস রোগীদের প্রতি ৬ মাসে আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও AFP পরীক্ষা করে লিভার ক্যান্সারের স্ক্রিনিং করা জরুরি। আগে ধরা পড়লে চিকিৎসার সুযোগ অনেক বেশি।
প্রশ্ন ৩: লিভার সিরোসিস রোগী কী খাবেন ও কী এড়াবেন?
উত্তর: প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার (ডিমের সাদা অংশ, মাছ, ডাল) পেশি ধরে রাখতে সাহায্য করে। লবণ কমাতে হবে কারণ লবণ পেটে পানি জমানো বাড়ায়। মদ্যপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ, হার্বাল বা সাপ্লিমেন্ট খাবেন না।
মনে রাখবেন:
✓ হেপাটাইটিস বি পজিটিভ থাকলে নিয়মিত ফলোআপ সিরোসিস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়
✓ লিভার সিরোসিসে হার্বাল বা কবিরাজি ওষুধ বিপজ্জনক
✓ প্রতি ৬ মাসে আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও AFP পরীক্ষা করে লিভার ক্যান্সারের স্ক্রিনিং করুন
✓ সন্দেহ হলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন
